সর্বশেষ
মঙ্গলবার ২রা মাঘ ১৪২৪ | ১৬ জানুয়ারি ২০১৮

আমরাও মানুষ নিয়ে কাজ করি স্যার

সোমবার ৩০শে অক্টোবর ২০১৭

2119494223_1509357468.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
২০ অক্টোবর কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে দেশবরেণ্য শিক্ষক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের নিবন্ধটি পড়ে মর্মাহত হলাম। আমরা যারা ফাইল নিয়ে কাজ করি, তারা মানুষ নিয়েও কাজ করি, এ বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য আমার মতো একজন সাধারণ কর্মকর্তার এ লেখার অবতারণা, যদিও শিক্ষকতা এবং শিক্ষক সত্তাকে আমি গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি।

স্যার, যারা ফাইল নিয়ে কাজ করেন, তাদের আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষমতা আমি রাখি না। কিন্তু জেলায়, মফস্বলে, উপজেলায় এবং গ্রামে আমাদের জীবনের সিংহভাগই কাটে মানুষ নিয়ে। দিন-রাত ছোটাছুটি করতে হয় পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও কৃষিবিদসহ সরকারি সংস্থা ও সার্ভিসের ব্যক্তিদের। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সারা দিন-রাত তো কাটে মানুষ নিয়ে। সারা দিন মানুষের সুখ-দুঃখের বৃত্তান্ত শুনতে হয়। ক্রমাগত ৮ বছর ৫ জেলায় যখন এসিল্যান্ড এবং এডিসি পদে কাজ করেছি, তখন গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের কান্না, যন্ত্রণা এবং জীবনের স্পর্শকাতরতা অনুভব করেছি। মনে পড়ে, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে নদীরপাড়ে সাপের উপদ্রবের মধ্যেও অফিস করেছি রাত-দিন, তা শুধু মানুষের জন্যই। সেসব স্মৃতি এখনও প্রখর হয়ে আছে। মানুষকে প্রতিকার, সমাধান ও পরামর্শ দিয়ে আমরা অনাবিল আনন্দ পাই। স্যার, আমরা যারা ফাইল নিয়ে কাজ করি, সেসব ফাইল লাখ লাখ মানুষের প্রত্যাশা পূরণের কেন্দ্রবিন্দু। একেকটি ফাইল মানুষের আবেদন-নিবেদনের ইতিহাস, স্বপ্নভঙ্গ কিংবা স্বপ্নপূরণেরও ইতিহাস। তবুও আমরা মানুষকে আশার বাণী শোনাই, সম্ভাবনার খবর জানাই। ফাইল জনগণের কাছে কখনও প্রাপ্তির আনন্দ, কখনও অপ্রাপ্তির বেদনা। এভাবে অনেক ফাইল সামাজিক গবেষণার উপাদান এবং ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হয়েছে, বিশ্বজুড়ে রয়েছে পুরনো ফাইলের সংগ্রহশালা।

মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে আমরা মানুষের মধ্যেই হারিয়ে যাই। মানুষের সুখ-দুঃখ, আর্তনাদের আমরা নিত্যসঙ্গী। যারা মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বে আছেন, তাদের ২৪ ঘণ্টাই কর্মস্থলে অবস্থান করতে হয়। এভাবে আত্মীয়তার বন্ধনে বিনোদন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে। আমাদের মোবাইল ফোন মুহুর্মুহু ব্যস্ত থাকে মানুষের জন্য। আমাদের দফতরগুলোয় প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয় মানুষের দাবি। গণশুনানি নিতে নিতে আমরা ক্লান্ত হলেও বিরক্ত হই না। কারণ মানুষের অভিযোগ শোনাও পরম সেবা। স্যার, আপনি বলেছেন, যাদের চোখে রঙিন চশমা এবং যারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, আপনি তাদের নিয়ে কাজ করেন। আমরাও এ মুহূর্তে দুদকের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ‘সততা সংঘ’ আর ‘সততা স্টোর’ গঠন করে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তৈরি করছি। স্যার, শুধু কি ডিগ্রি অর্জন কিংবা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হওয়াই জীবনের সার্থকতা? পড়াশোনা করে সার্টিফিকেট নেয়া এবং এরপর চাকরি বা ব্যবসার জন্য চলছে কী প্রাণপণ যুদ্ধ। সম্পদ আহরণ ও ভোগের দুরন্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত সমাজে হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা। ভার্চুয়াল প্রযুক্তির জগৎ আঘাত করছে তরুণদের নৈতিকতাকে, পাল্টে যাচ্ছে তাদের জীবনধারা। অথচ তরুণ প্রজন্মের জ্ঞানার্জনের সমান্তরালে প্রয়োজন নৈতিক জীবনচর্চা, নৈতিকতার পরিচর্যা। পুঁজিবাদের প্রবল স্রোতে সৃষ্টি হচ্ছে প্রচণ্ড বস্তুবাদিতা ও ভোগবাদিতা, এতে ভেসে যাচ্ছে আমাদের ন্যায়নীতি-সততা। গ্রাস করছে এক ধরনের ভয়ানক ঐন্দ্রজালিকতা।

রোহিঙ্গা শিবিরে অসহায় মানুষদের জন্য রাত-দিন কাজ করছে প্রশাসনের ৪১ জন কর্মকর্তা এবং ৫০ জন চিকিৎসক। এদের সবার এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের চোখে ঘুম নেই। এ সময়টিতে আমাদের কারও সেমিনার বা টকশোতে বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মুক্তজীবনের যে স্বাদ, স্যার আমরা তো তা থেকে বঞ্চিত। আমাদের নেই অবসর সময়ের রোমান্টিকতা, আছে শুধু মানুষকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার রূঢ় বাস্তবতা।

স্যার, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবীরাই প্রবেশ করে সিভিল সার্ভিসে, যেখানে ফাইল নিয়েই তাদের কর্মজীবনের হাতেখড়ি। ফাইল দিয়ে নির্ণীত হয় কর্মকর্তাদের কাজের সাফল্য নিরীক্ষণ, ব্যর্থতা মূল্যায়ন। আমরা যে ফাইল নিয়ে ছুটে বেড়াই, ওই ফাইলে আছে রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভাগ্যলিপি, স্বপ্ন। তাই আমরা মানুষের মনন ও অনুভূতির অপরিহার্য অংশ। ফাইলবিহীন প্রশাসন বা সেবা কার্যক্রম কি কল্পনা করা যায়? স্যার আপনি আরও বলেছেন, আপনারা যন্ত্র নিয়ে কাজ করেন না। কিন্তু যে ট্রাফিক পুলিশটি রাস্তায় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অবিশ্রান্ত কাজ করে, সে-ও যান্ত্রিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করে রাত-দিন। তার জীবন কাহিনী নিয়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

যত আইন প্রণয়ন, উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং এসব কর্মযজ্ঞের যত তথ্য-উপাত্ত, তার সবকিছুর সূচনা ও সমাপ্তি ফাইলে। ফাইল তো অর্থহীন কিছু নয়। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের যত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন, ফাইল হল তার অপরিহার্য বাহন। ফাইল থেকে আবিষ্কৃত হয় দুর্নীতির ঘটনা, আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার তথ্যের বাহক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ‘ফাইল’। স্যারের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তো নিজস্ব প্রশাসনিক জগৎ আছে। তার সবই তো ফাইলের বৃত্তে আবর্তিত। প্রতিদিন ভিসি মহোদয় এবং ডিন ও চেয়ারম্যান স্যাররা অজস ফাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

২০ ও ২১ অক্টোবর দেশজুড়ে নিম্নচাপ ও ভারি বর্ষণের মধ্যে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয়নি। কিন্তু ফাইল নিয়ে যারা কাজ করে, তাদের সবাইকে অফিস-আদালতে যেতে হয়েছে। ওই দুর্যোগময় সময়ে শত শত ডাক্তারকে বাসে চড়ে কিংবা রিকশায় চেপে দূরদূরান্তের হাসপাতালে, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ছুটে যেতে হয়েছিল। কারণ তারাও অগণিত অসুস্থ মানুষ নিয়ে কাজ করে, এটা তাদের জন্য অপরিহার্য মৌলিক মানবিকতা। আর অসুস্থ মানুষদের নিয়ে যারা কাজ করে, তাদের কষ্টের মাত্রা আরও বেশি। ডাক্তারদের পেশাগত কষ্টের ঘটনাগুলো এক একটি মহাকাব্য। স্যার, শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও মানুষের অগণিত ঘটনা ও দুর্ঘটনার কাছে আমাদের ছুটে যেতে হয়। হয়তো আমাদের কাছে নেই অগণিত পাঠক-দর্শক- শ্রোতা; কিন্তু আছে অগণিত সেবাগ্রহীতা, তাদের সঙ্গে রয়েছে সম্পর্কের আন্তরিকতা। আমার প্রত্যাশা, এ দেশের তরুণ প্রজন্ম প্রতিটি ফাইলে ইলেক্ট্রনিক গতি আনবে এবং সেবা আনবে সুপারসনিক গতির। প্রত্যাশা করছি এ শতাব্দীতে ‘ম্যানুয়েল ফাইল’ বিলুপ্ত হবে, প্রতিস্থাপিত হবে ‘ইলেক্ট্রনিক ফাইল’। কিন্তু ফাইলের অস্তিত্ব থাকবে, এটিই নিরেট সত্য ও বাস্তবতা।

মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী: মহাপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন
mmunirc@gmail.com

ঢাকা, সোমবার ৩০শে অক্টোবর ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // জে এইচ এই লেখাটি 30 বার পড়া হয়েছে