সর্বশেষ
মঙ্গলবার ২৭শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১১ ডিসেম্বর ২০১৮

আজ সেই ভয়াল ১৫ নভেম্বর

বুধবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৭

442783498_1510713842.jpg
বরিশাল ব্যুরো :
আজ ভয়াল সেই ১৫ নভেম্বর। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের ১০ম বার্ষিকী। ২০০৭ সালের এই দিনে সিডর নামক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল উপকূলবর্তী ৩০টি জেলায়। লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল সমগ্র উপকূলকে।

শতাব্দীর ভয়াবহ ঐ ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিল সাড়ে ৩ হাজার মানুষ। নিখোঁজ হয় আরো সহস্রাধিক। সরকারি হিসেবে ২০ লাখ ঘরবাড়ি ভেসে যায় পানির স্রোতে। প্রায় ৪০ লাখ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। মৃত্যু হয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার গবাদি পশুর। এর মধ্যে খুলনা বিভাগের বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরায় মারা গেছে ৭০ হাজার গবাদি পশু। বাকি গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছে বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়।

সিডরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাগেরহাট, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও বরগুনা জেলার। সিডরের ভয়াবহতা এতই নির্মম হবে তা বুঝতে পারেনি উপকূলভাগের বাসিন্দারা। সিডরের মাত্র কয়েক মাস পূর্বে সুনামির পূর্বাভাস ও তা আঘাত না হানায় সিডর নিয়ে আতঙ্ক ছিল না এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে।

১৫ নভেম্বর ছিল বৃহস্পতিবার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বার বার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে বসবাস করা বরগুনার পাথরঘাটা, আমতলী-তালতলী, পটুয়াখালীর বাউফল, কলাপাড়া, গলাচিপা, দশমিনা, কাকচিড়া, মাঝেরচর, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী ও ভোলার ঢাল চর, কুকরি মুকরি ও চর পাতিলার লোকজন আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতেও বেশ কিছু অতি উৎসাহী পর্যটক সেদিন থেকে গিয়েছিলেন।

চরমরানিন্দ্রা, হাসার চর ও আশার চরে মাছ ধরতে যাওয়া অস্থায়ী ভাবে বসবাসকারী শত শত জেলেরা সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন। অনেকেরই ধারণা ছিল শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু হবে না। বরিশাল মহানগরীও যেন মৃত নগরীতে পরিণত হয়। রাস্তায় মানুষ তো দূরের কথা কোন প্রাণীও ছিল না। বাতাসের তীব্র কানকাটা শব্দে সকল স্তব্ধতা ভন্ডুল করে দেয়। পুরো দক্ষিণ জুড়ে যখন মাতম শুরু করে ঘূর্ণিঝড় সিডর, ততক্ষণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে প্রেতপুরীতে পরিণত হয় পুরো দক্ষিণাঞ্চল।

সেদিন রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কিছু কিছু যোগাযোগ সম্ভব হলেও রাত ৯ টার পর আর কোন যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। দুর্গম চরগুলোর গবাদি পশুগুলো প্রাণে রক্ষা পেতে ছুটোছুটি করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে যেন সমর্পণ করে দেয়। শুধু গবাদি পশু নয় বন্য প্রাণীও মারা গেছে বহু। রাত বাড়ার সাথে সাথে তাণ্ডব বাড়তে থাকে। আতঙ্কিত প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে নতুন ভোরের অপেক্ষায় থাকেন সবাই। কিন্তু সবারই সেই সোনালি সকাল দেখার সৌভাগ্য আর কপালে জোটেনি। নিজের জীবন ও প্রিয় স্বজনকে নিয়ে যারা প্রাণে বেঁচে গেছেন তাদেরও খোয়া গেছে সহায় সম্বল।

সিডরের পরদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দক্ষিণাঞ্চলে দেখা দেয় হাহাকার। লাশ খোঁজার পাশাপাশি খাবারের আশায় ত্রাণের সন্ধানে ছোটেন ক্ষুধার্ত মানুষ। কিন্তু গত ৯ বছরেও তাদের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে সরকারি তরফ থেকে তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এরই মাঝে আবার ঘুরে এসেছে ভয়াল সেই স্মৃতির দিন।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার দেউলি সুবিদখালীর সিকান্দার আলী ভয়াবহ ঐ রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'বাতাসের একটা মোচড়েই সবকিছু শেষ করে দিয়ে গেছে।'

বাকেরগঞ্জের ফলাঘর গ্রামের প্রতিবন্ধী আবুল হাওলাদারের পুত্রবধু মুক্তা বলেন, 'রাতে স্বামীকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম গভীর রাতে ঝরের তাণ্ডবে আমার পাশেই লাশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি স্বামী রুবেল হাওলাদারকে। আর কিছুই বলতে পারবোনা। কারণ তখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সকালে মানুষের ঢল নামে আমাদের পোড়া কপাল দেখতে। আমার স্বশুর প্রতিবন্ধী আবুল হাওলাদার আজ ভিক্ষা করে সংসার চালান। আমাদের সংসারে একমাত্র আয়ের উৎস ছিল রুবেল।'

বাউফলের চর ফেডারেশনের খোরশেদ গাজী বলেন, 'সেদিন রাতে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ ৫ সন্তানকে হারিয়েছি। আজ আমার সংসারের হালধরার কেউ নেই।'

রাজাপুরের নারিকেলবাড়িয়ার আনোয়ার হোসেন জানান, 'বাতাসের তাণ্ডব এত ভয়াবহ হবে সন্ধ্যায় বুঝিনি।'

বাড়িতেই ঘুমিয়েছিলেন গালুয়ার নাসিমা বেগম। রাতের তাণ্ডবে পরিবারের কে কোথায় ছিল তা জানেন না। পরদিন সকালে ১০ বছরের শিশু সন্তান মাহমুদকে মৃত অবস্থায় কুড়িয়ে এনেছিলেন একটি গাছের নিচ থেকে।

ভয়াবহ এসব স্মৃতি মনে উঠলে এখনো মূর্ছা যান দক্ষিণ জনপদের মানুষ। তবুও তাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে অজানা আশঙ্কার মাঝেই। পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার এখনো নির্মাণ শেষ হয়নি। প্রকৃতির রুদ্ররোষকে মোকাবেলা করেই তারা বেঁচে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সব বঞ্চনাকে মেনে নিয়েছেন। পার করে দিয়েছেন সিডর-পরবর্তী ৯টি বছর।

মির্জাগঞ্জ উপজেলায় সিডরে প্রাণ হারিয়েছিল ১১৬ জন। ২ হাজার গবাদিপশুর সঙ্গে ভেসে গিয়েছিল ২০ হাজার হাঁস-মুরগি। উপজেলার ৫ হাজার ২০টি পরিবার সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝালকাঠিতে সিডরে প্রাণ হারিয়েছে ৪৭ জন। ফলে বিভীষিকাময় ছাইপোড়া দাগ এখনো মন থেকে ঘোচাতে পারেনি এ অঞ্চলের মানুষ।

ভয়াল সেই রাতের কথা মনে উঠলেই আঁতকে ওঠে এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। দক্ষিণাঞ্চলসহ বরিশালের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী সিডর পুরো এলাকাকে করে দিয়েছিল লণ্ডভণ্ড। বরিশালেই কেড়ে নিয়েছিল ১৮টি তরতাজা প্রাণ। সিডরের আঘাতে ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছিল অসংখ্য পরিবার। সেই দিনের দুঃসহ বেদনার কথা আজো ভুলতে পারেনি ক্ষতিগ্রস্তরা।

ঢাকা, বুধবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // এস আর এই লেখাটি বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন