ব্যাপক হারে বাড়ছে রোহিঙ্গা ভিক্ষুক
ব্যাপক হারে বাড়ছে রোহিঙ্গা ভিক্ষুক

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নিরুপায় রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়ছে ভিক্ষাবৃত্তিতে। কক্সবাজার থেকে চকরিয়া পর্যন্ত বেড়ে চলেছে রোহিঙ্গা ভিক্ষুক। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ভিক্ষা করছেন রোহিঙ্গারা। আর এ সংখ্যা প্রতিদিন যেন পাল্লা বাড়ছে। হঠাৎ ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলের চিত্র পাল্টে যেতে বসেছে।

রোহিঙ্গারা এদেশে আশ্রয় নিলেও পুরোপুরি অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভরশীল এদের জীবন। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, উখিয়া-টেকনাফ সড়কে এখন প্রায় ৩ লাখ ভিক্ষুক প্রতিদিন চোখে পড়ে। যারা আগে থেকে দেশে ছিলেন তাদের সাথে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়েছে ভিক্ষাবৃত্তিতে। প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে ভিক্ষাবৃত্তি। নতুন পুরাতন রোহিঙ্গা মিলিয়ে ভিক্ষুকের আনুমানিক এ সংখ্যা বের করা হয়েছে। কেউ রাস্তার দু’ধারে কেউ ক্যাম্পের সামনে ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে বসে আছেন। পাশে থাকে ছোট্ট শিশুরা। অসুস্থ্য ও প্রতিবন্ধী রোহিঙ্গাদের সামনে রেখেও চলছে ভিক্ষাবৃত্তি। এক সময় রোহিঙ্গা ভিক্ষুকদের স্থানীয় লোকজন সাধ্যমত ভিক্ষা প্রদান করতেন। কিন্তু এখন এত বেশি রোহিঙ্গা ভিক্ষুক বেড়েছে তাতে ভিক্ষা মিলছেনা আগের মত।

দিনের বেশিরভাগ সময় শূণ্য হাতে বসে থাকেন তারা। কক্সবাজার থেকে গোপনে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারি উপজেলায় চলে আসেন শতাধিক রোহিঙ্গা। দুই সপ্তাহ আগে চলে আসা রোহিঙ্গারা দোহাজারির সড়ক পথেই ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বসেন। এখনো প্রায় প্রতিদিন তারা ভিক্ষা করে যাচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের কোন ধরনের নজরদারি নেই।

ভিক্ষুকের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়তে থাকায় কক্সবাজারের পুরো এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা পাল্টে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনপ্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, অনাহারি রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে সহায়তা করতে গিয়ে তারাও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। ভিক্ষাবৃত্তি বাড়তে থাকলে স্থানীয় লোকজনও পথের ফকিরে পরিণত হবেন। কারণ লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে ভিক্ষা দেওয়ার সামথ্য নেই স্থানীয় লোকজনের।

এদিকে, রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া কোনভাবেই থামছে না। চট্টগ্রামের হাটহাজারী পৌর এলাকার কামাল পাড়ায় অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে আশ্রয় নেয়া ১৮ রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে অভিযান পরিচালনা করেন হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাসুম। আটককৃত রোহিঙ্গাদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু রয়েছে।

জানা যায়, আটক ১৮ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যের মংডু হাদি বিল এলাকার বাসিন্দা। হাদি বিল থেকে পালিয়ে এসে গত তিন দিন উখিয়ায় অবস্থান করার পর যানবাহনে চড়ে হাটহাজারীতে চলে আসে।

আবদল্লাহ আল মাসুম জানান, সোমবার দিবাগত রাতে পৌর এলাকার কামাল পাড়ার জনৈক নূরুল আলমের ভাড়া বাসায় অবৈধভাবে ২৩ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দুপুর ২টায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের মধ্যে ১৮ জনকে আটক করা হয়। তাদের উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তিনি আরো জানান, যারা রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে আশ্রয় দিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, লম্বাবিল সীমান্ত দিয়ে প্রচুর রোহিঙ্গা আসছেন। সেই এলাকা দিয়ে আসা মংডুর চালি প্যারাং এলাকার রশিদ উল্লাহ (৬৫) পরিবারের ৭ সদস্য এবং একই এলাকার ইব্রাহিমকে (৩৫) স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে আসেন। তাদের অভিযোগ দুই সপ্তাহ আগে মিলিটারি ও মগেরা মিলে তাদের উপর গুলিবর্ষণ করলে তারা ১২দিন পালিয়ে জঙ্গলে থাকার পর মঙ্গলবার সকালে নাফনদী তীরে পৌঁছেন এবং সেখান থেকে জনপ্রতি চল্লিশ হাজার টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার টাকা) নৌকা ভাড়া দিয়ে এপারে এসেছেন। তারা বলেন, আমরা আর ওই দেশে যেতে চাই না। তারা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ আর গ্রামের পর গ্রাম, ভিটেমাটি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। প্রতিরোধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে তারপর এক কাপড়ে কোলের সন্তান নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। কেউ সাতদিন, কেউ চারদিন আর কেউ ১৫ থেকে ১৬ দিন পায়ে হেঁটে মিয়ানমারের সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন। মিয়ানমারে চরম সহিসংসতার শিকার হয়ে শরণার্থী হয়ে যাবার এ দুঃসহ স্মৃতি তাড়া করছে উদ্বাস্তু হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের।

পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে মানবিকতার চরম বিপর্যয়ে পড়া রোহিঙ্গারা সেই দুঃসহ অতীতে আর ফিরতে চান না। জন্মভূমি মিয়ানমার তাদের কাছে এখন নির্মমতার জনপদ। তারা আর কোনোভাবেই ফিরতে রাজি নন সেই জনপদে।

তারা জানান, সব রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাবাসী যারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী তারাও এসেছেন একই আক্রোশের শিকার হয়ে। এ ধরনেরই ৬ শতাধিক মানুষের একটি দল এখন কুতুপালং নাথ পাড়ায় অবস্থান নিয়েছে। সেখানে ১২ ফুট বাই ৬০ ফুট আয়তনের একটি পরিত্যক্ত শেডে গাদাগাদি করে থাকছে প্রায় চারশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ ও শিশু। বাকিরা থাকে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তির বাসাবাড়িতে। ওই এলাকায় ঠাঁই নেওয়া লোকজন মংডুর চিকনছড়ি, গারতি বিল, সাহেব বাজার ও ফকিরাবাজার এলাকার বাসিন্দা। এরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাথে একই পাড়ায় বসবাস করত বলে চিকনছড়ির বকুল বালা (৪৫) জানান। তিনি বলেন, এক রাতে একদল মুখোশধারী লোক আমাদের পাশ্ববর্তী পাড়ায় হামলা চালিয়ে ৮৬ জন হিন্দুকে হত্যা করে। এরপরদিন আমাদের পাড়া থেকে হত্যা করে আরো চারজন হিন্দুকে। এরপর আমরা প্রাণেরভয়ে মুসলমানদের সাথেই এদেশে চলি আসি। এখানে আসা হিন্দুদের অনেকেই স্বজনহারা। নারীরা স্বামীহারা।

মংডুর ভুচিদং টমবাজারে কাজ করতেন হাবিবুর রহমান। স্ত্রী-সন্তানসহ ১২ জন নিয়ে বাংলাদেশে আসা হাবিবুর বলেন, আমার ভাইকে মেরে ফেলেছে। সেখানে যেতে বেশি ভয় লাগছে। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছি মরতে হলে মুসলমানের দেশে গিয়ে মরবো।

প্রতিদিন ৫০ হাজার প্রবেশ:
স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, নিপীড়নের মুখে এরই মধ্যে জীবন বাঁচাতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার করে শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। তবে এখন যারা আসছেন তাদের প্রায় সবাই আসছেন সীমান্ত থেকে দূরের টাউনশিপগুলো ও গ্রাম থেকে। রাখাইন পাহাড়ের ওপারে অবস্থিত ভারতের মিজোরাম সীমান্ত থেকেও মানুষ আসছে বাংলাদেশের দিকে। স্থানীয়রা আরো তিনদিন আগের থেকেই বলছেন বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। গত তিনদিনে এসেছেন আরো অন্তত দেড় লাখ। মিয়ানমারে বর্তমানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর যে জাতিগত নিধন চলছে, তা অব্যাহত থাকলে আরো অন্তত ৫ লাখ শরণার্থী বাংলাদেশে আসবে। ফলে এবার বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। তবে রোহিঙ্গাদের ধারণা এ সংখ্যা হবে কম করে হলেও ১২ লাখ। অবস্থা সম্পন্ন কিছু রোহিঙ্গা পরিবার সেখানে আছে। এই ধনিক শ্রেণীর ওপর কখনো আঘাত আসেনি। এবারও সেই আশায় অভিজাত এই রোহিঙ্গা শ্রেণী মিয়ানমার থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সর্বশেষ আক্রমণ হচ্ছে তাদের ওপর। সেনা সদস্যরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে বলছে, তোমরা বাংলাদেশি। তোমরা ধান কাটতে এসেছিলে। তোমরা এদেশে থাকতে পারবে না। বাংলাদেশে ফিরে যাও। এখানকার কোন সম্পদই তোমাদের না।

টংবাজারে বড় একটি দোকান ছিলো ফাইজুল্লাহর। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় কোটি টাকার মালামাল ছিলো তার। মাঠে ছিলো ১৬ কানি জমি। পুকুর ছিল অনেক। বছরে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি টাকার মাছ হতো সেখানে। মুসলিম, বৌদ্ধ, হিন্দু সবাই সম্মান করতো সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য। তাই তিনি সব ফেলে আসতে চাননি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় মগ ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হলো জীবন নিয়ে বাঁচতে হলে বের হয়ে যাও। তার সামনেই দোকান পুড়িয়ে দিয়ে বাড়িতে আগুন দেয়া হলো। কোন রকম জীবন বাঁচিয়ে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন তিনি।

ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৩(বিডিলাইভ২৪)