সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার ঢিমেতালে
সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার ঢিমেতালে

জোয়ারের পানিতে প্রতিদিন গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। পানি ঢুকে পড়ায় মানুষ ঘরে থাকতে পারছে না। ফসলি জমি লবণাক্ততার কবলে পড়ায় উৎপাদনে ধস নামছে। এ অবস্থা বরগুনার তালতলীর জয়ালভাঙা এলাকার। স্থানীয় উপকূলীয় সুরক্ষা বাঁধটি সিডরের সময় ভাঙলেও মেরামত করা হয়নি।

ওই গ্রামের বৃদ্ধ আবদুর রশিদ বললেন, “জোয়ারের পানিতে জায়গাজমি সব লবণে শ্যাষ, কোনো ফসল অয় না, ঘরে থাকমু হেই অবস্থাও নাই, এখন পাশের বাঁধের ওপর খুপরি তুইল্লা হেইহানে পরিবার নিয়ো থাকি।”

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে সিডরের তাণ্ডবে বরগুনাসহ বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ৮২ পোল্ডারে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। প্রলয়ঙ্করী ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারায় ৩ হাজার ৩৪৭ জন। গত ১০ বছরে মাত্র ৬৩৮ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। সেই কাজও চলছে ঢিমেতালে। ধীরগতির এই পুনর্বাসন কর্মসূচি কোটি মানুষকে ভোগাচ্ছে। তবে বাঁধ থেকে দূরে যাদের বসবাস, তাদের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। সেখানে সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় আধা পাকা ঘর উঠেছে, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বদলে গেছে।

পাউবোর বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সরদার সাজেদুর রহমান বলেন, আমরা সবগুলো বাঁধের উচ্চতা বাড়িয়ে সংস্কার করতে চাই। সরকারও এ ক্ষেত্রে আন্তরিক। কারণ আমাদের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ স্বাদু পানির সংস্থান এবং লবণাক্ততা দূরীকরণ। কিন্তু আমার মনে হয়, গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার ক্ষেত্রে পাউবো তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না, যেমনটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) পাচ্ছে। তার মতে, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো ও সড়ক নির্মাণের আগে এসব স্থাপনার সুরক্ষা প্রয়োজন। উপকূলে এসব অবকাঠামোকে সুরক্ষা দিতে পারে কেবল টেকসই বাঁধ। কিন্তু পাউবোর এই গুরুত্ব বোঝানোর ক্ষেত্রে তাদের কিছু অক্ষমতাও আছে।
 
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, সারা দেশে পাউবোর ১১ হাজার ৪৩০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৬০ কিলোমিটার উপকূলীয় সুরক্ষা বাঁধ। এর অধিকাংশই বরিশালের ছয় জেলায় অবস্থিত। এখানে ৮২টি পোল্ডারের আওতায় প্রায় ৩ হাজার ৫৬২ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, ভোলা, পিরোজপুর ও বরিশালে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার বাঁধ সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ১৮০ কিলোমিটার সম্পূর্ণ এবং ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটারের আংশিক ক্ষতি হয়। এরপর ঘূর্ণিঝড় আইলা ও মহাসেনে ৫২৭টি বাঁধের ৬৮ দশমিক ৮ কিলোমিটারের সম্পূর্ণ ও ৫ দশমিক ১৯ কিলোমিটারের আংশিক ক্ষতি হয়। এক থেকে দেড়’শ কিলোমিটার বাঁধ নিয়ে একেকটি পোল্ডার।

ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো মেরামতের জন্য প্রথমে ২০১০ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘ইসিআরআরপি’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। তা দিয়ে বরগুনা সদর, আমতলী, বেতাগী ও পাথরঘাটা এবং পটুয়াখালীর বাউফল ও চরকাজল এলাকায় ৯টি পোল্ডারের প্রায় ৩০০ কিলোমিটার বাঁধ উঁচু করে সংস্কার ও ব্লক বাঁধাইয়ের কাজ শুরু হয়। তহবিল জটিলতায় বছর দুয়েক কাজ বন্ধ থাকে। ২০১৪ সালের জুনে তা পুনরায় শুরু হয়। এখন ৬টির কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। বাকি তিনটির কাজ চলছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে এর মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

সরেজমিন তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া ও জয়ালভাঙায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অন্তত চার কিলোমিটার বাঁধ এখনো বিলীন। জোয়ারের পানিতে প্রতিদিন মাইলের পর মাইল ফসলি জমি ও গ্রামীণ বাড়িঘর প্লাবিত হচ্ছে। একই অবস্থা পাথরঘাটার পদ্মা, জিনতলা, হাজিরখাল, রুহিতা, চর লাঠিমারা, বাদুড়তলা এলাকায়। পদ্মা গ্রামে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকতে ঢুকতে ফসলি জমির মধ্যে একটি খাল হয়ে গেছে। খাল ধরে পানি চলে যায় অনেক দূর। লোনা পানিতে প্লাবিত হচ্ছে কয়েক হাজার একর ফসলি জমি। পুরো এলাকায় বাড়ছে লবণাক্ততা। পদ্মা গ্রামের সানু মাঝি আক্ষেপ করে বলেন, এই এলাকার জমিতে এখন আর ফসল ফলে না। আমাগো না খাইয়া মরণের জোগাড় অইছে।

বাঁধ সংস্কারে আরও উদ্যোগ: পাউবো সূত্র বলছে, চলতি বছর বিশ্বব্যাংকের সিইআইপি প্রকল্পের আওতায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বরগুনার আরও দুটি, পটুয়াখালীতে তিনটি ও পিরোজপুরের একটি পোল্ডারের বাঁধ সংস্কার ও উঁচুকরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী মৌসুমে কাজ শুরু হবে। এর বাইরে ভোলায় পাঁচটি পোল্ডারের সংস্কারকাজ চলছে সরকারি অর্থায়নে। সেখানে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ পাঁচটি পোল্ডারের আওতায় ২৫০ কিলোমিটার বাঁধ নাজুক। এর মধ্যে ৯৬ কিলোমিটারের অবস্থা খুবই নাজুক। পাউবোর বরিশাল অঞ্চলের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই ১১টি পোল্ডারের বাঁধ মেরামত শেষ হতে আরও অন্তত চার বছর লাগবে। ফলে সহসাই দুর্গতি থেকে নিস্তার পাচ্ছে না এ অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী। বাকি ৬২টি পোল্ডারের বিপুল পরিমাণ বাঁধ সংস্কারে সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগই নেই। অথচ ষাটের দশকে নির্মিত এসব বাঁধ খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। ক্ষয়ে ক্ষয়ে উচ্চতা কমে গেছে। জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধগুলো আর উপকূলবাসীকে সুরক্ষা দিতে পারছে না।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হলেই এসব বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। প্রত্যেক অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ারে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। দিনে-রাতে দুবার ঘরদোর ছেড়ে বাঁধে উঠতে হচ্ছে লোকজনকে। বিপুল ফসলি জমি অতিমাত্রায় লবণাক্ত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কবলে পড়ছে কৃষি উৎপাদন। ভাসিয়ে নিচ্ছে মাছের ঘের। ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থা। হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য ও মানুষের পেশা।

পাউবোর উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের ৮২টি পোল্ডারই উঁচু করে সংস্কার ও ব্লক দিয়ে পাড় বাঁধাই করা প্রয়োজন। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এর কোনো বিকল্প নেই। সেটা করতে না পারলে উপকূলবাসীর জীবন-জীবিকা বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি কৃষিসহ পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে।

কৃষিতে বিপর্যয়: সর্বশেষ কৃষি জরিপের তথ্য বলছে,উপকূলের প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার পরিবারের জীবিকার মূল উৎস কৃষি। লবণাক্ততা, বৈরী আবহাওয়াসহ নানা ঘাত-প্রতিঘাতে কৃষিক্ষেত্র বিপর্যস্ত হচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউটের ২০১৩ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বরিশাল বিভাগের ৭ লাখ ৪১ হাজার ৩১০ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ১৮০ হেক্টর জমি অতিলবণাক্ত। সময় বিশেষে লবণের মাত্রা ১৬ থেকে ২৮ দশমিক ৫ ডেসিসিমেন (প্রতি ঘনমিটার পানি) উঠছে। মাত্রাটা ৪ থেকে ৮ ডেসিসিমেন পর্যন্ত থাকলে ধান চাষ সম্ভব।

বরিশাল অঞ্চলে সবচেয়ে লবণাক্ততার ঝুঁকিতে আছে পটুয়াখালী। এখানে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৪৮ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ১ লাখ ৫৫ হাজার ১৮০ হেক্টরই লবণাক্ত। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বরগুনা ও ভোলা। লবণাক্ততার ফলে গত পাঁচ বছরে এসব জেলায় ফসল উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৩ লাখ ৩৭ হাজার ২০০ মেট্রিকটন (হেক্টরপ্রতি ৫ মেট্রিকটন হিসেবে)। জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে সরকারের সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের (আইএসএমসি) বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের কৃষি বিশেষজ্ঞ মো. শহিদুল্লাহ বলেন, লবণাক্ততার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান ফসল আমনের উৎপাদন অনেক কমেছে। ব্যাপক হারে উচ্চ-ফলনশীল জাতের ধান চাষ করে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে এটা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। তাই সমস্যার গোড়ায় হাত দিতে হবে। লবণাক্ততা রুখতে বাঁধ সংস্কারসহ যা যা দরকার, তা এখনই করতে হবে।

ঢাকা, নভেম্বর ১৪(বিডিলাইভ২৪)